সবচেয়ে আপন! – Khoborbd24
গল্পসাহিত্য

সবচেয়ে আপন!

তারিক রেজা আলী

পুরনো বাড়ীর পুরনো স্টোর রুম পরিষ্কার করা কি সহজ কাজ? শতেক নয় হাজারো জিনিস কিভাবে যে এই রুমে রাখা হয়েছে কে বলবে। একদিনের তো আর নয়, বছরের পর বছর এখানে রাখা হয়েছে খাট, টেবিল, চেয়ার, দাদার আমলের রান্না করার বড় বড় হাড়ি-পাতিল, স্টোভ এমন কি বাথরুমের নষ্ট কলও। কেয়ারটেকার পরিষ্কার করে, ঝাড়-মোছও করে। না হলে রুমে প্রবেশ করাই দুঃসাধ্য ছিল। কি রাখব আর কি ফেলে দেব চিন্তা করছিলাম। এগুলো আর কোনদিনই কাজে লাগবে না, আমি জানি। কিন্তু ফেলে দিতে অস্বস্তি লাগে। দাদা-দাদীর জিনিস যেমন আছে, তেমনি আছে মা-বাবারও সংসারের অনেক কিছু। মুক্তিযুদ্ধের পর ফিরে এসে দেখা গেল বাড়ীতে কিছু নেই, নেই তো নেইই, এমনকি ভাত খাওয়ার প্লেটও নিয়ে গেছে রাজাকাররা। তখন আমার নানা মাকে কিনে দিয়েছিলেন ছয়টি প্লেট। সেই প্লেটও দেখলাম এক কোণায় রাখা। না, ছয়টি নেই, তিনটে টিকে আছে।

ফেলতে গিয়ে ফেললাম না প্লেট গুলো। আমার মা-বাবার দ্বিতীয়বার শুরু করা নতুন সংসারের স্মৃতি। আছে সেই আমলের কিছু গ্লাস, চামচও। নেড়ে চেড়ে রেখে দিলাম। এমন সময় চোখে পড়লো এক আয়না। বেশ বড়, এক পাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে উল্টো দিক করে রাখা। চারপাশ মুছে খুব সাবধানে আমার দিকে ফিরালাম। নিজের ঘর্মাক্ত মুখ দেখে চমকালাম না। মনে করার চেষ্টা করলাম এই আয়না টা কোথায় ছিল। নীচে কাঠে খোদাই করা কিছু লেখা আছে দেখে পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করলাম। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম নাম লেখা আছে ‘আয়তন্নেছা’- আমার দাদীর নাম। আবছা আবছা মনে পড়লো কাঁঠাল কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল এক ড্রেসিং টেবিল, যার রঙ ছিল ঐ কাঁঠালি হলুদ, বয়স ছিল প্রায় আমার বাবার বয়সের সমান, আর আয়নার নীচে একদিন আমি আর আমার চাচাতো ভাইয়েরা মিলে আম কাটার ছুরি দিয়ে কাঁচা হাতে খোদাই করেছিলাম দাদীর নাম। টেবিল টি কোথায় হারিয়ে গেছে অথবা আছে বোধ হয় এই রুমেরই অন্য কোথাও, কাঁচটা খুলে রাখা হয়েছে আরেক দেয়ালে।

আমি নস্টালজিক মানুষ। হাঁটু গেড়ে বসে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করলাম ঐ লেখা। কতই বা বয়স আমাদের, ৮ থেকে ১২। সবার চেহারা ভেসে উঠলো। ভাইয়েরা এখন সব শুভ্র শশ্রুমণ্ডিত, মাথায় চুল গেছে কমে। আর ঐ যে আমার দাদী হাসছে আমাদের দিকে তাকিয়ে। ফোকলা দাঁত, ফর্সা গোলগাল মুখ। পান খেয়ে লাল করা ঠোঁটে সে হাসি কতই না মিষ্টি। আমাদের শিল্পকর্মে মুগ্ধ হয়ে আমার পিতা যখন সবাইকে বিচারে উদ্যত হলেন, কি চমৎকার ভাবে আড়াল করলেন আমাদের সবাইকে আমদের দাদী, যাকে আমরা ডাকতাম ‘বু’ বলে। গভীর মমতায় আয়নাটাকে মুছতে লাগলাম আমি।

এক নেশায় জড়িয়ে গেলাম । প্রতিদিন যেতে ইচ্ছে করে ঐ ঘরে, ঐ আয়নার কাছে। কি যেন হয় আমার, অতীত অনেক কিছু স্পষ্ট দেখতে পাই। একেকটি ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন গল্প হয়ে ধরা দেয়। ঐ যে এক মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, নীল শাড়ী দিয়ে এত বড় এক ঘোমটা দিয়েছেন, মুখ কোন ভাবেই দেখতে পাচ্ছি না। আমি ওনাকে কোনদিন দেখিনি। কিন্তু মনে হয় আমার অনেক কাছের, আমি যেন অবশ্যই চিনি। কি বলতে চান তিনি? এগিয়ে যাই আয়নার কাছে। ফিসফিস শব্দে তিনি কি বলেন বুঝি না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। আলো আর পারিপার্শ্বিক সব কিছু অনেক খানি স্পষ্ট হয়। হ্যাঁ, এবারে আমি শুনতে পাই তিনি বর্ণনা করছেন ভাওয়াল জমিদারদের অত্যাচারের কথা। বলছেন তিনি আমার চার পুরুষ আগের, আমারই বংশের। একদিন স্নানে নেমেছিলেন বাড়ীর পুষ্করিণীতে। এমন সময় দেখতে পেলেন জমিদার এসেছে শিকারে। নজরে পড়ে গেলেন তার। পরের কাহিনী বড় মর্মান্তিক। ধরে নিয়ে যাওয়া হলো তিন মাইল দূরের রাজবাড়ীতে। তার পরের কাহিনী আর বর্ণনা করতে পারলেন না। কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। এত স্পষ্ট সে কান্না, আমি শুনতে পাচ্ছি, হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। কোন প্রতিকার বা প্রতিশোধ হয় নি এই অত্যাচারের। আশেপাশের কত শত তরুণী এরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে তার খবর কে রাখে। কি ঘটেছিল পরে তাদের জীবনে? ইতিহাস নীরব। ইতিহাস শুধু জানে রাজাদের জীবন কাহিনী। ভাওয়ালের রাজার সন্ন্যাসী হওয়ার কাহিনী। আবার জমিদারী ফেরত পাওয়ার কাহিনী। এই মেয়েদের কত জন আত্মহত্যা করেছিল, কতজনকে পরিবারের লোকজন নিজেরা বিষ খাইয়ে মেরেছিল, কত জন উন্মাদ হয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়েছিল তার হিসেব কেউ জানে না। আজ এত দিন পর ভাল এক শ্রোতা পেয়ে উজাড় করে দিলেন তিনি মনের সকল কথা এই অভাজনের কাছে।

চোখ মুছি। ঘর থেকে বের হয়ে আসি। মন বলে চলে যাব নগরে। এখানে আর থাকব না। কিন্তু কি এক নেশায় থেকে যাই। পরদিন আবার গিয়ে দাঁড়াই ঐ আয়নার সামনে। এবার এসেছেন এক বয়স্ক পুরুষ। নীল রঙের মোটা কাপড়ের লুঙ্গি, ঊর্ধাঙ্গ অনাবৃত। মাথায় আবার এক তেল চিটচিটে টুপি। সরষের তেলের পরিষ্কার ঘ্রাণ পাই আমি, বেয়ে পড়ছে তার কানের পাশ দিয়ে। মনে মনে শুধাই, ইনিও কি আমার পূর্ব পুরুষ? উত্তর আসে, হ্যাঁ, এ অঞ্চলে যখন কিছু ছিল না তখন আমি এসেছিলাম এখানে। সব আগাছা, জঙ্গল পরিষ্কার করেছি, জমি বের করেছি শাল বনের পেটের ভিতর থেকে। সংসার হলো, ছেলে-পুলে বড় হলো, একদিন আমি মারা গেলাম। কিন্তু দেখো আমার কবরের ওপর দিয়ে এখন বড় রাস্তা। যখন আমার কবর হলো কিছুই ছিল না চারপাশে। এখন ছয় চাকা ওয়ালা বড় বড় লরি, ট্রাক, গাড়ী চলে বুকের ওপর দিয়ে। কি তাদের অহংকার। শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়। কি যন্ত্রণা। মাথা নীচু করে থাকি আমি। বলার চেষ্টা করি এটাকেই বলে মানব সভ্যতা। আমরাও মারা যাব। দুই পুরুষ পরে কেউ মনে রাখবে না। কে জানে আমার কবরের উপর নির্মিত হবে না এক বিশাল বিপনী বিতান! হতেই পারে। সন্ধ্যে বেলায় উজ্জ্বল আলোয় কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকবে আধুনিক নর-নারী। তারা জানবেও না এই অট্টালিকার নীচে শুয়ে আছে তাদের কত শত পূর্ব পুরুষ। এসব নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে হে আমার পিতৃ পুরুষ। এখানে মন খারাপের কোন সুযোগ নেই।

কত কিছু যে ঘটে যায় ঐ আয়নার সামনে। কিছু বুঝতে পারি, বেশীরভাগই ধরতে পারি না। আসেন বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, আসে শিশুরা। দল বেঁধে আসে, কলকাকলিতে চারদিক ভরিয়ে দিয়ে আবার হারিয়ে যায়। এবারের যে বৃদ্ধ এসেছেন, তিনি আমার বড় চেনা। তার কোন ছবি আমি দেখিনি কোন দিন, কিন্তু বুঝতে পারি তিনি আমার পিতার পিতা। মাত্র দুই পুরুষ আগের, আমার পিতামহ। নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকি, চোখ জ্বালা করে। কালো শক্তিশালী শরীর, একটু খানিক হাত-পা নাড়ালে নড়ে ওঠে সুঠাম দেহের পেশি সমূহ। এত বয়সেও বোঝা যায় সারা জীবন কি কায়িক পরিশ্রমই না করেছেন। আমার চোখে প্রশ্ন দেখতে পেয়ে তিনি বলে ওঠেন আমার না জানা এক গল্প। সেবার ধান হয়েছিল ভাল। ঘরে ছিল কাঁচা টাকা। শেষ রাতে এলো ডাকাতের দল। চোখ-মুখ ঢাকা সবার। তাকে বেঁধে রেখে সব নিয়ে গেল তারা। অবাক হয়ে দেখলেন দলের এক সদস্য তার এক পরমাত্মীয়। অস্ফুট ভাবে কি কোন আওয়াজ করেছিলেন তিনি? এতদিন পর কোন কিছু মনে নেই, শুধু মনে আছে তীক্ষ্ণ ছুরির ফলা ঢুকে গেল পেটে, বের হয়ে এলো সব নাড়ি-ভুড়ি। আশ্চর্যের বিষয় তারপরেও বেঁচে গেলেন। শহরের বড় হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ফিরে এলেন তিনি। কিন্তু বিচার হলো না কিছুর। বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কেঁদে ফিরলো শহরের বড় বড় প্রাচীরের পাথুরে দেওয়ালে। আমি শুধু শুনে যাই, এতদিন পর কি কোন প্রতিকার করার ক্ষমতা আছে আমার? তার চোখের দিকে তাকিয়ে ম্রিয়মান হয়ে যাই। সাদা সফেদ ভ্রুযুগলের নীচে চকচকে চোখের দিকে দ্বিতীয়বার আর তাকাতে পারি না। এতদিন পর আমার কি করার আছে হে পিতামহ? এর থেকে সব ছেড়ে দিন মহাকালের হাতে। সবচেয়ে বড় অত্যাচারীও জানে এইদিন শেষ নয় আরো দিন আছে। একদিন না একদিন প্রতিকার পাবেই মজলুম। দুর্বলের আশ্বাস শুনে হেসে ওঠেন তিনি। মিলিয়ে যান হাওয়ায়।

সবাই চলে যায়। আমি বসে থাকি চুপটি করে। এই ঘর এই বাড়ী সব মিলিয়ে যায়। উপরে থাকে শুধু তারা ভরা আকাশ। নীচে মাটি। আছে গাছ পালা। আছে বুনো ফুল। সরিসৃপ হেঁটে বেড়ায়। আমাকে তারা কেউ দেখে না। আমিও কি কিছু অনুভব করি? কিছুই না। কোন ভয় নেই, ক্ষোভ নেই, নেই কোন প্রতিহিংসা। আমার দিকে স্বস্নেহে তাকিয়ে থাকে শুধু ঐ দূর আকাশের তারা। আমিও চোখ ফিরাই না। যত যাই বলি আকাশের তারা যতই দূরে থাকুক, সেই মানুষের সব চেয়ে আপন, কোন দিন ছেড়ে যায় না।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds