পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ – Khoborbd24
ঘরবন্দী ঈদ

পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ

তাসফীর ইসলাম (ইমরান)

নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হিমেল।দুই ভাই,এক বোন আর মা-বাবাকে নিয়েই হিমলের পরিবার।বাবার সাথে অন্যদের কাজ করে পরিবার ও নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে গ্রাম থেকেই এইচএসসি পাশ করেন।ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনা ও পরিবারকে একটু ভাল রাখার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যান ছোট-খাটো একটা কোম্পানিতে চাকরির জন্য,পাশাপাশি চালিয়ে যান নিজের পড়াশুনাও।হিমেলের গ্রাজুয়েশন শেষ হওয়া অবদি এভাবেই কোন মতে চলে যাচ্ছে তার সংসার।ছোট ভাইবোনদের সকল চাহিদা না মিটাতে পারার আক্ষেপ তার ভিতরটাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে।

 

এক গ্রাম পরে নামকরা জাফর তালুকদারের একমাত্র মেয়ে রুবার সাথে হিমেলের গত পাঁচ বছরের সম্পর্কের ইতি হলো হিমেল-রুবার বিয়ের মাধ্যমে।রুবার পরিবার এই বিয়েতে প্রথমে অসম্মতি থাকলেও রুবার অনুরোধে পরবর্তীতে তারা মেনে নেয় হিমেল-রুবাকে।এতে সংসারের ভারটা আরও যেন কঠিন থেকে কঠিনতর কঠিন হয়ে ঘারে পরে হিমেলের।যদিও এমন দূর্দিন আর বেশিদিন থাকলো না।

 

শেষমেস গ্রাজুয়েশনটা শেষ হলো হিমেলের।এটা হিমেলের বিয়ের মাস দুয়েক পরের কথা। গ্রাজুয়েশন শেষ করার বদৌলাতে তার চাকরিরও প্রমোশন হয়।তার বেতন এখন বিশ হাজারো টাকা,যা হিমেলের কাছে সপ্নের মতো।বিয়ের দুইদিন পরেই রুবাকে হিমেলের পরিবারের সাথে রেখে চলে আসতে হলো।চাকরিতে ফিরতে দেড়ি হলে তার বেতন মাইনাস হবে তাই।আর সামনে দুই মাস পরেই ঈদ,এসময় টাকাই বেশি জরুরি।

 

হিমেলের বহু সপ্ন,জল্পনা-কল্পনা এবারেই ঈদকে ঘিরে।আগে সবসময় পরিবারের সাথে ঈদ করলেও ছোট ভাই-বোনদের সকল ঈদ চাহিদা মেটাতে না পারায় ঈদ আনন্দ তাকে এতবছর স্পর্শ করতে পারেনি।এবার তার চাকরির বেতন বেশি,সাথে পাবে মোটা অঙ্কের একটা ঈদ বোনাস।একারনে হিমেলের প্রত্যাশাটাও বেশি।

 

এর মধ্যেই সমগ্র পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের(কোভিড-১৯) প্রভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে লক্ষ লক্ষ মানুষ করনা আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।আর করোনায় আক্রান্তে ছেয়ে যায় সমস্ত শহর।একারনে শহর গুলোতে লকডাইন করা রাখা হয়। হিমেল যে কোম্পানিতে চাকরি করে সে কোম্পানিও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়,ফলে বেতন আটকে যায়।হিমেলের সপ্নও থমকে দাঁড়ায়।এবারের ঈদে ছোট ভাই-বোনদের চাওয়া আর আর তাদেরকে দেওয়া হিমেলের প্রতিশ্রুতির মাঝখানে দূরত্বটা কেবল দেয়ালের।

 

ঈদের আর মাত্র একদিন বাকি!হিমেল বুঝতে পেরেছে তার ঈদে বাড়ি আসা আর সম্ভব নয়,আর কোনো সুযোগও নেই।পরিবারের ছাড়াই করতে হবে এবারের ঈদ।ছোট ভাই-বোনরা বার বার হিমেলকে ফোন দিয়ে বলে ভাইয়া আর কবে,কখন আসবা তুমি?আমাদের বন্ধুদের সবাই ঈদের মার্কেট করা হয়ে গেছে!শুধু আমাদেরটাই বাকি!আমরাও ওদের বলে দিয়েছি ভাইয়া এবার অনেক কিছু নিয়ে আসবে,তোদের থেকেও বেশি নিয়ে আসবে!ভাই-বোনদের অবুঝ প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা হিমেলের।রুবা তো ফোনে কেবল কেঁদেই যাচ্ছে সারাক্ষণ,প্রিয় দিনে প্রিয় মানুষকে কাছে না পাওয়ায় ক্ষোভে।কেঁদে যাচ্ছে লাশের এই শহরে হিমেলকে রুবা ফিরে পাবে তো!বাবা-মায়ের কান্না হিমেলের শুধু কানেই শুনতে পায়না,কান্নার শব্দে হ্রদয়টা যেন চৌত্র মাসের খরায় ফেটে ফেটে চৌঁচির।

 

ঈদের দিন এলো।কিন্তু ঈদ করা হচ্ছেনা হিমেলের পরিবারের।প্রেয়সীর সাথে হিমেলের প্রথম ঈদটাও ঈদ নয়,চিত্তক্ষোভ!পরিবার ও প্রিয়জনদের ছাড়াই হিমেলের এই প্রথম ঈদ!প্রিয় সময়ে প্রিয়জনদের সাথে থাকতে না পারার আক্ষেপের চেয়ে বড় কিছুই নেই।যদিও লাশের শহরের এখন বেঁচে থাকাটাই সপ্ন।হিমেলের চাওয়া শুধু আপনজনদের নীড়ে ফেরা।

 

বেঁচে থাকাটাই কেবল প্রার্থনা!ফিরবে তো হিমেল?

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds