পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ – Khoborbd24
ঘরবন্দী ঈদ

পরিবার ছাড়া প্রথম ঈদ

মুগনী মুদারী

বয়স যখন একুশ কি বাইশ,শুধুমাত্র নিজের তৈরী করা জগৎটাতে সময় কাটাতে খুব বেশি পছন্দ করতাম।সেই গন্ডির বাইরে বেড় হতে ভালো লাগত না।ঈদে বাবা মা-র সাথে বাড়ি যাবো না,ঢাকায় থেকে যাবো,ঈদে বন্ধু বান্ধবদের সাথে ঘুরে বেড়াব।এসমস্ত বিষয় নিয়ে প্রিয় মানুষগুলোর সাথে প্রতি ঈদেই ঝগড়া বিবাদ ঘটতো।মান অভিমান বিরাজমান রেখে গ্রামের বাড়ি সবার সাথে ঈদ করতে ট্রেন ধরতাম।সেই বয়সটাতে এটা বুঝতাম না যে দিনশেষে সেই বাড়িতেই ফিরে আসা লাগে।

 

আজ লকডাউনে আটকে আছি আটাত্তর দিন।বাড়ি থেকে অফিস যেতে যাতায়াত অসুবিধার কারণে বাসা নিয়েছি অন্য জায়গায়,অফিসের কাছাকাছি।এখান থেকে আমার নিজ বাড়ি অর্থাৎ যেখানে আমার পরিবার মা বাবা থাকেন তার দুরত্বটা খুব একটা বেশি না।শহরের ব্যস্ত রাস্তার জ্যাম ছাড়িয়ে যেতে ঘন্টা খানেকের মতো সময় লাগে।যদি দুরত্বটা খুব বেশি হতো তাহলে হয়তো এতটা আফসোস হতো না।এইটুকু দুরত্বে প্রিয় মানুষগুলোকে ছেড়ে থাকা যায় না।এই পরিস্থিতির যখন সূচনা হচ্ছে তখনও ভাবছিলাম কিছু হবে না তেমন একটা।কয়দিন দেরি করে হলেও নিজ বাড়ি যাওয়া যাবে।আর কটা দিন গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাক।ধারণা ভুল ছিল,সিদ্ধান্তও ভুল ছিল।নিঃসঙ্গতা গ্রাস করছে ক্ষণে ক্ষণে।

আগে বারান্দায় প্রকৃতি আর মানুষের সমাগম দেখে অনেকটা সময় কাটানো যেত।জনমানবশূন্য এলাকা এখন আর দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না।বাড়িতে থাকলে সকাল বেলা উঠে প্রিয় মানুষগুলোর মুখ দেখা হতো,ছোট বোনটার সাথে প্রতিনিয়ত ঝগড়া হতো,মা-র সাথে খাবার নিয়ে ভেজাল লাগতো।আবার মা-র কাছে যেয়ে জেদ করে বলতাম, “না এইটাই খাবো,এটাই বানিয়ে দিবে।” বাবার সাথে দাবা খেলা হতো।তাও কিছু করা হতো।এখানে বেলা বারোটায় ঘুম থেকে উঠে জল ছেটানো ঝাপসা আয়নায় নিজের মুখ দেখতে ভালো না।এখানে আমি জোড়ে চিৎকার দিয়ে কথা বললে আমার কন্ঠটাই আবার আমার কানে আসে।এখানে ডাকলে কাওকে পাওয়া যায় না।

একবারের একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।ব্যাপক ঝগড়া হয়েছিল বাড়ির লোকেদের সাথে।ঝগড়ার বিষয়বস্তু ছিল ঈদে সবার সাথে গ্রামের বাড়ি যেতে আমি অনিচ্ছুক।পড়ার টেবিলে বসে রেগেমেগে বলছিলাম,”আমার জন্য যাতে টিকেট না কাটা হয়।” মা সেইবার খুব মন খারাপ করেছিল।এক সন্তান সাথে থাকবে,তাও আরেক সন্তানকে রেখে ঈদ ভালো কাটবে না।এটা আমার গোবর ভরা মগজে কোনোদিনও ঢোকেনি।আজ যখন হাতে করার মতো কোনো কাজ নেই,ব্রেন অকেজো হয়ে আছে তখন আগের সেই স্মৃতিগুলো এসে আফসোস জমাচ্ছে।

 

বাড়িতে তিনজন আছে।মা বাবা আর ছোটো বোন।তারা একসাথে থাকা সত্ত্বেও আমার অভাবটা অনুভব করছে।আর আমি এখানে একা।ঈদ আসতে বেশি দেরি নেই।এবারের ঈদটা অগোছালো স্যাঁতসেঁতে এই এক কামরায় একাকি কাটাতে হবে.

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds