স্বপ্ন এবার বাড়ি যাবে না – Khoborbd24
ঘরবন্দী ঈদ

স্বপ্ন এবার বাড়ি যাবে না

মাহফুজা আফরোজ সাথী

আমার শিকড় শরিয়তপুর হওয়া সত্ত্বেও জন্ম, লেখা-পড়া, বেড়ে ওঠা, চাকরি সবই ছিল ঢাকা কেন্দ্রিক। গত বছরের আগস্ট মাসে জীবনে প্রথম পরিবার পরিজন ছেড়ে চাকরির সুবাদে চট্টগ্রামে চলে আসি। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ সব কিছুর সাথে তাল মিলিয়ে ওঠার আগেই হয়ে যায় ঈদুল আজহার  ছুটি। ছোট থেকে দেখতাম পাড়ার প্রতিবেশী এমন কি আত্মীয়দের অনেকেই নাড়িরটানে গ্রামের বাড়িতে রওনা হয় ঈদের ছুটিতে।  কতই না কষ্ট করে তারা বাড়ি যেত, দেখতাম আর ভাবতাম এত কষ্ট করে কেন বাড়ি যেতে হবে? কত কত দুর্ঘটনা ঘটে তবুও ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যেতেই হবে।  খুব অবাক হতাম কিন্তু সেবারই বুঝলাম আত্মীয় স্বজনের কাছে ফেরার যে কি আনন্দ।  যেদিন বাড়ির পথে রওনা দিলাম সেদিন প্রকৃতিও যেন বেঁকে বসলো। প্রচন্ড বৃষ্টি,যেখানে সামান্য বৃষ্টি হলেই চট্টগ্রামের রাস্তায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় সেখানে সে দিন কুকুর বিড়াল বৃষ্টি হচ্ছিল।  আমার ফ্লাইট ছিল ১২.৪৫ মিনিটে, বৃষ্টির জন্য জ্যাম হতে পারে তাই ভেবে সকাল১০.০০ টায় বেরিয়ে পরলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। বহু কষ্টে একটা সি এন জি চালিত অটোরিকশা নিয়ে রওনা হলাম। বিভিন্ন জায়গায় পানি পেড়িয়ে এয়ারপোর্টের  কাছাকাছি এসে বন্ধ হয়ে গেল অটোরিকশা।  প্রচন্ড বৃষ্টির জন্য রাস্তায় জনমানবের কোন চিহ্ন মাত্র নেই। একটু অস্বস্তি লাগছিল, উবার কল করছিলাম কিন্তু এত অল্প পথ কেউ নিতে চাইছিল না। এ দিকে বৃষ্টি ও বাড়ছিল, হঠাৎ একটা টমটম এলো- কোন পথ খুঁজে না পেয়ে ওটাতে করেই এয়ারপোর্টে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এয়ারপোর্টের গেটে এসে হলো আরেক বিপত্তি, টমটম তো এয়ারপোর্টে ঢুকতে দেবে না তাও আবার ভি আই পি গেইট বলে কথা। সিকিউরিটি অফিসারকে অনেক অনুনয়-বিনয় করার পর তারা আমাকে যেতে দিলেন। টমটম নিয়ে যখন ভি আই পি গেইট দিয়ে ঢুকছি সবাই অবাক হয়ে দেখছিল আর হয়তো ভাবছিল যে, এ কে রে বাবা টমটম নিয়ে এয়ারপোর্টে এসেছে। তখন কোন দিকেই আমার খেয়াল নেই ফ্লাইট মিস করা যাবে না,কেননা ঈদের সময় ফ্লাইটে টিকেট পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার।  এখানেই শেষ নয় ১২.৪৫ এর ফ্লাইট ছাড়লো ৩.৪৫ এ।ঢাকায় অবতরণ করা মাত্র এখানেও শুরু হলো অঝোরে বৃষ্টি। কোনমতে একটা উবার নিয়ে রওনা হলাম বাসার পথে।প্রচন্ড যানযটে বসে থেকে দীর্ঘ দুই ঘন্টায় পৌছাঁলাম ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে বিজয় সরণীতে, পৌঁছানোর পর ঘটলো আরেক দুর্ঘটনা, উবারের ড্রাইভার কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,  “আপা আমাকে ভাড়া দিতে হবে না আমাকে ছেড়ে দেন আমি যাবো না, মাফ করেন আপা।”  আমি তো পরলাম বিশাল বিপদে, কোন উবারও পাচ্ছি না কি করি কি করি, নেমে গেলাম রাস্তায় তখনো বৃষ্টি হচ্ছে,  কূলকিনারা না পেয়ে কল দিলাম উবার মোটর। মোটরসাইকেলে করে বাসায় পৌঁছাতে রাত বাজলো ৮ টা। এত ঘটনা দূর্ঘটনার পর যখন মাকে জড়িয়ে ধরলাম মনে হলো সত্যি “স্বপ্নই বাড়ি যায়। ”

 

আজ ২০২০ সাল সারা বিশ্ব করোনা ভাইরাসের ছোবলে ক্ষত বিক্ষত।  এবার ঈদের আমেজ আর নেই, নেই বাড়ি ফেরার তাড়া। কারণ এ অদৃশ্য শত্রু এতটাই ভয়াবহ যে আমরা জানি না আদৌও আমি আমার পরিবারের জন্য ঝুঁকি বহন করছি কি না।

 

তাই যেখানে আছি, সেখানেই থাকি। দূরে থাকি কিন্তু সকলে সুস্থ থাকি এটাই এবারের চাওয়া।

 

এবার স্বপ্ন বাড়ি যাবে না।  এবার স্বপ্ন ঘরে আবদ্ধ থেকে পরিজনকে সুস্থ রাখতে অঙ্গীকার বদ্ধ।

 

করোনা পরিস্থিতি সামলে গেলে আবার বাড়ি যাবে স্বপ্ন,  মিলবে প্রানের মেলা, বসবে রঙের হাট।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds