ঘরবন্দী ঈদ – Khoborbd24
ঘরবন্দী ঈদ

ঘরবন্দী ঈদ

রেজাউল ইসলাম রেজা

ঈদ’ শব্দটা আমাদের মুসলিম সভ্যতায় বয়ে আনে আনন্দের বার্তা। মুসলিম উম্মাহ’র জন্য সর্বোচ্চ খুশির দিন। আমাদের সমাজে যারা বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ আছে, যারা সংসারের প্রয়োজনে বাড়ির বাহিরে থাকে। তারা বছর শেষে এই ঈদেই নাড়ীর টানে বাড়ি ফেরে। দেখা হয় চেনা মুখগুলোর সাথে। আবার ফিরে যাওয়া যায় শৈশবে। সুমধুর কোলাহলে মুখরিত হয় প্রিয় আঙ্গিনা। গ্রাম, শহরের প্রতিটি অানাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে অানন্দ, ঢেকে যায় উৎসবের চাদরে।

এ বছরের ঈদ আমাদের জীবনে সম্পূর্ন ভিন্নরুপে আবর্তিত হতে যাচ্ছে, এমনটা না ভাবার আর কোনো অবকাশ নেই।। এই মহামারী করোনার কারণে বিশ্বেজুড়ে লকডাউন পন্থা অবলম্বন করায়, রমজান মাস আমাদের জন্য আনন্দের হলেও তার ছিটে ফোটাও তেমন একটা দেখা যায় নি। বিগত দিনগুলোয় রমজান মাস আসলে সবার মাঝে আলাদা খুশি দেখা যেত। সবাই মিলে একসাথে ইফতার করা, রাতে তারাবীহর নামাজ পড়া, ভোর রাতে সাহরীতে সবাইকে ডাকা, যেন এক উৎসব। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উৎসবের অনেকটাই ব্যপ্তয় ঘটেছে। করোনা মহামারীর সাথে আবার যুক্ত হয়েছে ঘূর্নিঝড় ‘অাম্পান’।

ঘরবন্দি এই অাসন্ন ঈদে হয়ত দেখা হবে না পরিবারের সবার প্রিয় মানুষটির সাথে। যার সাথে বিগতদিনের মত একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি হবে না এবার। দেখা হবে না স্ত্রীর সাথে স্বামীর। যে মানুষটি বছরের শুরুতে কথা দিয়েছিল, “ইনশঅাল্লাহ বেঁচে থাকলে আবার ঈদের ছুটিতে আসবো, দেখা হবে তোমার সাথে”৷ যে মা তার ছেলের জন্য অধীর আগ্রহে দিনের পর দিন অপেক্ষায় ছিল, তার ছেলের প্রিয় পছন্দের আমের আচার নিয়ে আশায় ছিল, তার ছেলে এত বছর পর এবার ভিন দেশ থেকে দেশের বাড়ি পা রাখবে। সে আশাও হয়ত বৃদ্ধ মায়ের চোখের জলে ভেসে যাবে। একরাশ অভিমান নিয়ে সীমাহীন কষ্টে, দীর্ঘশ্বাসে উড়ে যাবে প্রবাসীর স্ত্রীর তার স্বামীকে কাছে পাওয়ার আকুতি।

দেখা হবে না প্রিয় বন্ধুটির সাথে। যার সাথে স্কুলজীবনের পর থেকে আর দেখা হয় নি। একবুক ভালোবাসা নিয়ে যে অপেক্ষায় ছিল এই ঈদে আবারও। সে আশায়ও গুড়ে বালি। বাবা তার সন্তানদের জন্য ঈদের নতুন পোশাক নিয়ে আসবে, এমনটা ভেবে যে চোখগুলো তাকিয়ে ছিল অদূরপানে, যেখানে আনন্দের ঢেউ বার বার আছড়ে পড়ছিল মনের সীমান্তে, সেখানেও হয়ত কষ্টের জল উপচে পড়বে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যার উপর পরিবারের সবাই তাকিয়ে থাকে, গত দুমাস ধরে ঘরে বসে থাকার কারণে, হয়ত তার পক্ষে সম্ভব হবে না, সন্তানদের জন্য ভালো কাপড়, ভালো খাবারের আয়োজন করা। যে মানুষটি সারাদিন রিকশা চালিয়ে দিন আনে দিন খায়, সেই অসহায় মানুষটির অসহায়ত্বের কারণে তার চুলাও হয়ত এই ঈদে প্রাণ ফিরে পাবে না।

ঈদের দিন সবাই একসাথে হাতে হাত রেখে ঈদের নামাজে যাওয়া, নামাজের পর সবার সাথে কোলাকুলি, করমর্দন করা, বন্ধু বান্ধব, অাত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি দাওয়াত খেতে যাওয়া, এবার আর হবে না। ভালোবাসারা খাঁচা বন্দি পাখির মত আটকে থাকবে সামান্য কয়েক বর্গফুট জায়গায়। যেখান থেকে বের হতে চাইলেও, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির অাঘাতে আবার আনন্দের অবসরে নিরবতারা মাথা তুলে উঁকি দিবে। যেখানে জীবনই সংকটাপন্ন, সেখানে এসব আবেগ হয়ত বিলাসীতা। তবুও আমরা এগুলো নিয়েই বেঁচে থাকি।

‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লিখে গেছেন একাত্তরের বেদনামাখা ঈদের কথা। তখনও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঈদ পালন করেননি জাতির বীর সৈনিকেরা। চারিদিকে আতঙ্ক ছিল। ছিল গোলাবারুদের শব্দ। ছিল অনিয়ত জীবন। আমরা শুনেছি কাশ্মীরে ঘর বন্দি মানুষের ঈদের কথা। শুনেছি সীমান্তে পাহারারত সৈনিকদের কাটানো ঈদের কথা। শুনেছি জেলখানায় বন্দী মানুষের ঈদের কথা। শুনেছি ইরাক, আফগানিস্তানের মত যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের মানুষের ধ্বংসস্তুপের মাঝেও ঈদ উদযাপনের কথা। যেখানে প্রতি মুহূর্তে জীবন অনিশ্চিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে আসন্ন ঈদ আমাদের সবাইকে ঘরবন্দী করলেও কিছু মানুষের এই অবস্থা অভ্যাসগত। তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এখনও চারিদিকে ভয়, অাতঙ্ক। তবে নেই গোলাবারুদ বা বোমার বিকট শব্দ। অদৃশ্য শক্তির কড়াল গ্রাসে মানব সভ্যতা আজ পরাজিত।

এই ভয়াবহ নিষ্ঠুর ভাইরাস সবার কাছে থেকে ভালোবাসা, অাবেগ, অনুভূতি সব কেড়ে নিয়েছে৷ আমাদের বাঙ্গালীয়ানাকে বুড়ো অাঙ্গুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে সীমাবদ্ধ জীবনের আপেক্ষিকতার নিশানা৷ যেখানে কোনো কিছুই স্থির নয়। এই স্বল্প সময়ের আনন্দ যে কখনোই অসীম সময়ে চলমান থাকবে না, দিয়েছে তার প্রমাণ। বুঝিয়ে দিয়েছে ওই আকাশের মালিকের প্রতি আমাদের আনুগত্যের প্রচন্ড আবশ্যকতা। ক্ষনস্থায়ী জীবনে সময়কে মূল্য দেয়ার তীব্র প্রয়োজনীয়তা। হয়ত সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে পৃথিবী আবার ফিরে পাবে তার পুরনো রুপ। ধ্বংসস্তুপের মাঝেও রয়ে যাবে শিক্ষনীয় কিছু দিক নির্দেশনা। জাগ্রত হবে আমাদের বোধোদয়, এই কামনায়। তবুও সবাইকে অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা। ‘ঈদ মোবারক’।

 

 

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds