মনিরের ঈদ – Khoborbd24
গল্পসাহিত্য

মনিরের ঈদ

শাহজাহান

মনিরের মনটা সকাল থেকে খারাপ, কারণ আজ ঈদের দিন তার বাবা নেই।বাবাকে ছাড়া এটাই তার প্রথম ঈদ পালন। ঈদ পালন বললেও ভুল হবে। কেননা এবার ঈদের কোনো আনন্দই মনিরের পরিবারকে স্পর্শ করেনি। না করার ও যথেষ্ট কারণ আছে। আর সেটা হলো- মনিরের বাবা। মনিরের বাবার উপার্জন দিয়েই তাদের পরিবার চলত।মনিরের বাবা একজন গার্মেন্টস শ্রমিক। সে নারায়নগঞ্জের একটি গার্মেন্টসে চাকরি করত। বেতন ও ভাল পেত। যা দিয়ে তাদের পরিবার খুবই ভালভাবে চলে যেত। কিন্তু মার্চ মাসে করোনা ভাইরাসের কারণে নারায়নগঞ্জকে লকডাউন করা হয়। আর সেখানেই আটকা পড়ে মনিটরের বাবা।কিন্তু তার সাথে যে আরও তিনজন সহকর্মী থাকত তারা বাড়িতে চলে গেল।কারণ তাদের বাড়ি ছিল কুমিল্লা। কিন্তু রংপুর ঢাকা থেকে অনেকটা দুরে হওয়ায় আর গাড়ি চলাচল না করাই কালাম মিয়াকে থেকে যেতে হল।লকডাউনে মোটামুটি ভালই দিন যাচ্ছিল কালাম মিয়ার। কারণ সে প্রায় সব ধরনের রান্না-বান্না করতে পারত।ফলে সমস্যা বেশি হচ্ছিল না।রান্না-বান্না করার পর খাওয়া শেষ করে বাকি সময়টা বিভিন্ন টিভি চেনেল দেখেই কাটিয়ে দিত।এভাবেই দিন কাটতে লাগলো। একদিন সকাল ১১ টার দিকে কিছু কাচা বাজার কিনতে বের হলো।কিন্তু মুড়ের মুখের গলির দাড়ে দেখলো এক বৃদ্ধা মহিলা শুয়ে হাঁপাচ্ছে। পড়নের শাড়ির দিকে তাকালেই যে কেউ বুঝতে পারবে এ মহিলা কোনো সাধারণ ঘরের না। হয়ত কোনো বড় লোক সাহেবের মা।যার জায়গা সাহেবদের বাসা বাড়িতে হয়নি।ফলে তাকে রাস্তায় ফেলে গেছে। কাছে গিয়ে দেখলাম তার কপাল গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। দুটি পা ই ভাঙা। মনে হচ্ছে কেউ তার পা ভেঙে দিয়েছে।আপনার এ অবস্থা কেন? আমাকে আমার ছেলে এখানে ফেলে রেখে চলে গেছে। আমি আসতে না চাওয়ায় আমাকে অনেক মেরেছে।মনে হয় আমার দুটি পা ভেঙে দিয়েছে যাতে আর বাসায় ফেরতে না পারি। আপনার ছেলে কি করে? আমার ছেলের অনেক বড় ব্যবসা আছে। তিনটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিক। সেখান থেকে অনেক টাকা ইনকাম করে। তাহলে আপনাকে রাস্তায় ফেলে রেখে গেল কেন? জানিনা বাবা কেন রেখে গেল। শুধু বলল আমার ভিতর নাকি কি একটা রোগের লক্ষণ আছে। যদি আমাকে বাসায় রাখে তাহলে নাকি তাদেরও এ রোগ হবে। আমার জন্য নাকি ওরা মরতে পারবে না। জানো বাবা? এই ছেলেকে আমি অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছি।ওর যখন তিন বছর বয়স তখন ওর বাবা মারা গেল।আমার মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেছিল দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার জন্য। শুধু এই ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করিনি।যাতে ওর কোনো কষ্ট না হয়।কিন্তু আজ দেখ বাবা এই ছেলেই আমাকে রাস্তায় ফেলে গেল। আসলে ওনাকে কি বলে সান্তনা দিব আমি তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শুধু বললাম চলেন আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এই বলে বৃদ্ধা মহিলাকে কোলে ওঠালাম। হাসপাতাল খুব একটা দুরে ছিলনা।গলি থেকে একটু সামনে গেলে প্রায় ৩০০ মিটার দুরেই হাসপাতাল। তাই কোলে করেই নিয়ে গেলাম। তাকে ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করালাম। হাসপাতালের একাউন্টে ১৫০০ টাকা জমা দিতে বলল।যখন টাকা জমা দিতে যাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ পিছন থেকে এই কালাম? পিছনে ফিরে দেখলাম আমার কলেজ বন্ধু আতিক।আরে আতিক অনেকদিন পর দেখা, কি খবর তোর? এইতো চলছে কোনোরকম। তুই এখানে, কাকে নিয়ে এসেছিস? আতিককে সবকিছু খুলে বললাম।তাহলে তুই টাকা দিবি কেন?এসব রোগির জন্য আমাদের হাসপাতালে আলাদা ইউনিট আছে। তাদের কোন টাকা লাগে না। ফ্রি চিকিৎসা করা হয়। তাহলে তুই একটু ব্যবস্থা করে দে দোস্ত। তারপর আতিক সবকিছুর ব্যবস্থা করল।তাহলে তুই একটু ঐ মহিলার খেয়াল রাখিস। আমি আবার কাল আসবো।আচ্ছা ঠিক আছে। ঐদিন আতিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরলাম।আমার শার্টে অনেকটা রক্ত লেগেছিল। তাই বাসায় এসেই গোসল করলাম।রাতে প্রচন্ড জ্বর আসলো, সেই সাথে স্বর্দি- কাশি।সকাল বেলা আবার শ্বাস কষ্টও দেখা দিল।তাই আর হাসপাতালে যাওয়া হল না।সারাদিন বিছানায় শুয়ে রইলাম। সন্ধান দিকে আতিকের ফোন।ফোন রিসিভ করার সাথে সাথেই কিরে কালাম তোর আজ হাসপাতালে আসার কথা ছিল।হ্যা,কিন্তু কাল রাত থেকেই জ্বর, স্বর্দি-কাশি।সকাল থেকেই আবার শ্বাসকষ্টটা বেড়ে গেল।কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। শোন ঐ মহিলা কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে। আরেকটা কথা হল ঐ মহিলা করোনা পজিটিভ। কি বলছিস তুই? হ্যা, যা সত্যি তাই বললাম। তোর বাসার ঠিকানা দে। আমার মনে হয় তুইও করোনা পজিটিভ। কারণ তুই ঐ মহিলাকে কোলে করে হাসপাতালে এনেছিস।আমি আতিককে আমার বাসার ঠিকানা দিলাম।কিছুক্ষণ পরেই এম্বুলেন্স নিয়ে এসে দুইজন স্বাস্থ্যকর্মী আমাকে নিয়ে গেল।আমার অবস্থা খুবই খারাপ হচ্ছে সেটা আমি ভাল করেই বুঝতে পারছি। যদিও আতিক দুর থেকে অনেকবার বলল।তোর কিচ্ছু হবে না চিন্তা করিস না।আতিককে বাসার নাম্বার টা দিলাম।শোন আমি বোধহয় আর বাঁচবনা। আমার সুভাগ্য যে মরার আগে তোর মত বন্ধুর দেখা পেলাম। এখন অনেক টা নিজেকে হালকা মনে হচ্ছে। কারণ মরে গেলে অন্তত্য মরার খবরটা বাড়িতে দেওয়ার মত একজন আছে। শোন নাজমাকে বলিস মনিরকে দেখে রাখতে।ঐদিন রাতেই কালাম মারা গেল। এবং আতিক পরেরদিন সকালে সেই খবরটা দিল তাদেরকে। আর ঠিক তখন থেকেই তাদের পরিবার থেকে সুখ চলে গেছে।মনিরের মা ও আগের মত নেই।আগে সারাদিন হাসিখুশি থাকত।আর এখন একদম চুপচাপ হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া ও আগের মত করে না।তাইতো আজ ঈদের দিনও কোনো ভাল রান্না-বান্না হয়নি তাদের ঘরে। প্রতিবছর বাবার সাথে মনির ঈদের নামাজে যায়। কিন্তু এবার একাই যেতে হবে।কারণ বাবা নেই। মনির গোসল করে যখন ঈদের নামাজে গেল এবং মোনাজাতে নিজের বাবার জন্য দোয়া করল,আল্লাহ যেনো তার বাবাকে জান্নাতবাসী করেন।নামাজ শেষে যখন বাড়িতে এসে মাকে সালাম করবে তখন দেখল মায়ের চোখে পানি। মায়ের চোখে পানি দেখে মনিরও চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। মা আজ ঈদের দিনও তুমি কাঁদছ?তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড় তাহলে আমার কি হবে? আর তুমি সবসময় কান্না করলে তো বাবার আত্মা ওপারে কষ্ট পাবে। আমাদের তো বাবাকে নিয়ে গর্ব করা উচিত কারণ বাবা মানুষকে সাহায্য করতে গিয়ে মারা গেছেন। আর যারা মানুষকে সাহায্য করে আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ বাবাকে জান্নাতবাসী করেছেন। তাই তুমি আর কখনো কান্না করবে না। আর যদি কোনোদিন কান্না করো তাহলে আমিও বাবার মত তোমাকে ছেড়ে চলে যাব।না বাবা, এমন করে বলিস না। তুই না থাকলে আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? তুই না থাকলে যে আমিও বাঁচব না।তোর বাবার স্বপ্ন ছিল তোকে ডাক্তার বানাবে। তুই কথা দে তুই তোর বাবার স্বপ্ন পূরণ করবি। কথা দিলাম মা আমি আজ থেকে আরো ভালভাবে পড়াশোনা করব।তবে তুমি কিন্তু আর কান্না করতে পারবে না।আচ্ছা ঠিক আছে বাবা তাই হবে।

লেখক

তৃতীয় বর্ষ, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল।
০১৭১০-১১৪১৬৪

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds