ঢাকা-আগরতলা সাহিত্য আলোচনায় রবীন্দ্র মহাপ্রয়াণ – Khoborbd24
বিশেষ মতামত

ঢাকা-আগরতলা সাহিত্য আলোচনায় রবীন্দ্র মহাপ্রয়াণ

২২ শ্রাবণ বিশ্ব সাহিত্যের পুরোধা ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস।

আমাদের সাহিত্য গোষ্ঠী Dhaka-Agartala meet for Literature and Culture এ ওপার বাংলা-এপার বাংলার কয়েকজন ভীষণ গুণী মানুষদের নিয়ে রবীন্দ্র মহাপ্রয়াণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে  একটি শিল্প, সংস্কৃতি ও সাহিত্য আলোচনা হয়। খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু ড. সৌমিত্র শেখর এবং শিল্প ও সাহিত্য প্রাণ মানুষ  শ্রদ্ধেয় ওয়ালিউজ্জামান লুৎফুল আমান এর সার্বিক সমন্বয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানটির মধ্যমণি ছিলেন- বর্তমান সময়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জগতের দিকপাল, ভাষা গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের  খ্যাতিমান অধ্যাপক ড. শ্রী সৌমিত্র শেখর স্যার। অন্যান্যদের মধ্যে আলোচনা এবং সঙ্গীত অংশ নেন- ওপার বাংলার বিশিষ্ট নাট্য গবেষক শ্রী নারায়ন দেব, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক শ্রীমতি নন্দিতা দত্ত, বিশিষ্ট কবি শ্রী নৃপেন ঘোষ এবং খ্যাতিমান রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী শ্রীমতি সোনালী রায় বাগচী। এপার বাংলা থেকে অংশগ্রহণকারী ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব জনাব জিয়াউল হাসান কিসলু, বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী শ্রী দেবাশিস মিলন এবং কবি ভীষ্মদেব বাড়ৈ।

আলোচনার শুরুতেই ড. সৌমিত্র শেখর কবিগুরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের পর্বত সম আবির্ভাব আমাদের বাঙালি জাতিকে অস্তিত্বের সংকট হতে বাঁচিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ সংকটে-বিপদে আমাদের আলোর পথ দেখান। তিনি আরো বলেন, সাহিত্য সংস্কৃতিতে আমরা ঢাকা এবং কোলকাতা কেন্দ্রিক, কিন্তু কিন্তু মূলধারার সাহিত্য অঙ্গনে আগরতলা এবং ত্রিপুরার ভূমিকা যে অতি প্রাচীন তা আমরা ভুলে যেতে বসেছি। তিনি বলেন রবীন্দ্রনাথ সাত সাত বার ত্রিপুরাতে এসেছেন, ত্রিপুরার রাজপরিবারের সাথে তাঁর ছিল আত্মিক যোগসূত্র। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন তৈরিতে এ রাজ পরিবারের বিশেষ ভূমিকা ছিলো। ১৯২৬ সনে সর্বশেষ তিনি ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা হয়ে তিনি ত্রিপুরা যান। এখানেও তিনি ঢাকা ত্রিপুরার যোগসূত্র খুঁজে পান। ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, লালনকে আবিষ্কার করেন রবীন্দ্রনাথ। লালনের ১৯৮ টি গান শান্তি নিকেতন থেকে তিনি সংকলন করেন। এ সময়ে তা কলকাতাতে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন- অন্যকে আঘাত করার মধ্যে কোন গৌরব নেই, মাটির দিকে তাকাও, মানুষকে ভালবাস। তিনি ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে এবং আমার হিয়ার মাঝে মনোমুগ্ধকর আবৃত্তি করে শোনান। আর তাঁর  এ গান দুটি আবৃত্তির সাথে সাথে এ গানের ধ্বনি, হৃদয় ছোঁয়া মধুর নিবেদন বেজে উঠে দেবাশিস দাদার ললিত কন্ঠে।

শ্রী নৃপেন ঘোষ রবীন্দ্রনাথের উপর  লালনের প্রভাব এবং বাউল সত্তার উপর প্রাণবন্ত আলোচনা করেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী এবং রবীন্দ্রনাথের উপর স্ব-রচিত কবিতা পাঠ করেন।

প্রথিতযশা নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্রী নারায়ন দেব রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন, রাজর্ষি, রক্তকরবী নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি বলেন রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে আধুনিক জীবন ঘনিষ্ঠ নাটকের আবির্ভাব। রবীন্দ্রনাথ বাংলা নাটককে বিশ্ব সাহিত্যে সমাদৃত করিয়েছেন। তিনি আরো বলেন- ত্রিপুরার রাজবাড়িতে বিসর্জন নাটক অভিনীত হয়। বিসর্জন নাটকে রাজা গোবিন্দ মানিক্য পশু বলির বিরোধিতা করেন। পশু বলির রক্তের ধারা যখন নদীতে মিশে যায়, রাজা তখন উৎকন্ঠিত কন্ঠে বলে উঠেন- এতো রক্ত কেন? বলি বন্ধ কর। শ্রী নারায়ন দেব বলেন- আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগের এ সংলাপ আজো কতটা প্রাসঙ্গিক, এখানেই রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠতা। হায়! এ রক্তের ধারা এখনো বইছে!

শ্রীমতি নন্দিতা দত্ত বাংলা শিল্প সংস্কৃতিতে ত্রিপুরা রাজ পরিবারের অসামান্য ভূমিকার কথা আলোচনা করেন। তাঁর বিদগ্ধ আলোচনায় উঠে এসেছে- রবীন্দ্রনাথকে ত্রিপুরার উন্মুক্ত কুঞ্জ বনে মণিপুরি নাচের মাধ্যমে প্রথম সংবর্ধিত করেন ত্রিপুরার রাজ পরিবার। এই মণিপুরি নাচের নন্দনতত্ত্ব পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ সারা বিশ্ব ছড়িয়ে দেন। তিনি  বলেন ত্রিপুরার রাজা, রাজ পরিবারের সব সন্তানরা ছিলো বাংলা শিল্প সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, যাঁরা সবাই নাচ, গান ও কবিতা জানত। এ রাজ পরিবার বসু মন্দির, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তৈরিতেও বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শান্তিনিকেতন তৈরিতে ত্রিপুরার রাজ পরিবারের যে ভূমিকা তা আমরা সবাই জানি, অথচ শান্তিনিকেতনে ত্রিপুরার রাজ পরিরাবের উদ্দেশ্যে কোন সম্মান স্মারক নেই।

শ্রীমতি সোনালী রায় বাগচী বলেন- সৃষ্টির মাধ্যমে স্রষ্টা বেঁচে থাকেন, তাঁর কখনো প্রয়াণ হয় না। তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বাউল এবং ওয়েস্টার্ন মিউজিকের প্রভাবের উপর জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেন। তাঁর অমৃত কন্ঠে তিনি পরিবেশন করেন- ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে—–, আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে—-, এবং মাঝে মাঝে তব দেখা পাই চিরদিন কেন পাই নি—‘।

কবি ভীষ্মদেব বাড়ৈ রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় অমিতকে লেখা লাবন্যের সেই কালজয়ী বিদায় কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। তিনি ‘রবীন্দ্রনাথের জীবনে মৃত্যু প্রভাব ও  ভাবনা’ নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। তিনি বলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবদ্দশায় যে অতি নিকট জনের মৃত্যু দেখেছেন- তা অন্য কোন মানুষের জীবনে আসলে তিনি ওখানেই থেমে যেতেন। এতো শোকের মাঝেও তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন বিশ্ব-সমাদৃত সাহিত্য রত্ন। তিনি তাঁর জীবনকালে পর পর তিন সন্তান হারিয়েছেন, মা-বাবা, ভাই, প্রিয় স্ত্রী, প্রিয় নাতি, প্রিয় দুই ভ্রাতুষ্পুত্র, ভ্রাতুষ্পুত্রী এবং প্রাণ প্রিয় বৌদি কাদম্বরী দেবীকে হারিয়েছেন। সেজ বৌদি কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্র উত্থানের নেপথ্য নিয়তি, রবীন্দ্রনাথ কাননের গজমতি। সারি সারি মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তিনি জীবনের মনোহর রূপ দেখেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা, গান এবং লেখনীতে- বিদায়, বিচ্ছেদ এবং মৃত্যুকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। তিনি মৃত্যুকে দেখেছেন সুখসুপ্তির মতো এক শান্তিময় মনোহর অভিধায়। জীবনের প্রথম বেলাতে তিনি বলেছেন- ‘মরণরে তুহু মম শ্যামও সমান’। আবার  মৃত্যুর মাত্র  এক সপ্তাহ  পূর্বেও তিনি মৃত্যুকে  সম্বোধন  করে লিখেছেন- ‘তোমার সৃষ্টির রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী, মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতে নিপুন হাতে সরল জীবনে।’ অর্থাৎ তিনি জীবন শুরু করেছেন মৃত্যু ভাবনা দিয়ে আবার শেষও করেছেন মৃত্যু মাধুরী দিয়ে। মাঝখানে, জীবন, প্রেম, প্রার্থনা, বিদায়, বিরহ ও বিচ্ছেদ। মৃত্যুর মাঝে জীবনের স্ফুলিঙ্গ দেখতে পারার যে জীবনী তা শুধু রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই সম্ভব, এখানেই রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠত্ব। কবি ভীষ্মদেব বাড়ৈ তাঁর আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিভিন্ন বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে শোনান।

পরিশেষে, বর্তমান সময়ের বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল তারকা- অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রভাব নিয়ে একটি গল্প বলেন। তিনি বলেন, অনেক চেষ্টা সাধ্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক কোলকাতা ডাক্তার দেখাতে গেছেন। তিনি ভেবেছিলেন, কোন বড়সড় রোগ হয়েছে। কোলকাতার ডাক্তার তাকে বললেন- সামান্য সমস্যা। রোগী এতক্ষণে শুনতে পেলেন ডাক্তারের পিছনে মৃদু লয়ে বাজছে সাগর সেনের কন্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মোহন মুর্চ্ছনা – ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইন—‘, এ গান শুনেই তিনি অনেকখানি সুস্থ বোধ করলেন। ড. সৌমিত্র শেখর বললেন- আমাদের জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব এক মহাসমুদ্রের মতো। কোন নির্দিষ্ট  জায়গাতে তিনি স্থিত নন। তিনি সর্ব সময়ের, সর্ব কালের। এ মহামানবের প্রতি আবারো গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সোনালী দিদির সোনার কন্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে যে অনুষ্ঠান আমরা সন্ধ্যা ৮.৩০ শুরু করেছিলাম রাত ১০.৩০ মিনিটে তার যবনিকা ঘটলো।

যেন শেষ হয়ে হল নাকো শেষ, আর অমৃতলোকে থেকে গেল হৃদয়ের বহমান রেশ।

পুনশ্চ: অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখানোর কথা থাকলেও যান্ত্রিক  এবং  প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে তা দেখাতে পারিনি, এজন্য আমরা সবার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী।

লেখাঃ ভীষ্মদেব বাড়ৈ

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds