মনসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় খাদ্যের ভূমিকা – Khoborbd24
জীবনধারা

মনসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় খাদ্যের ভূমিকা

এম,এইচ,মোবাশ্বিরা

পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস মানসিক সুস্বাস্থ্যের অন্যতম চাবিকাঠি ”

মানসিক সুস্থতা ও রোগ সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১০ই অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় “বিশ্ব মানসিকস্বাস্থ্য দিবস”. এটি সর্বপ্রথম ১৯৯২ সালে পালন করা হয়েছিল। ডাব্লিওএইচও এর ২০০১ এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন মানুষ মানসিকব্যাধি নিয়ে বেঁচে থাকে যা বিশ্বব্যাপী অস্বাস্থ্য ও অক্ষমতার অন্যতম একটি কারণ।বর্তমানে করোনা পরিস্থিতিতে মানুষিক চাপ ও যন্ত্রনায় ভুগছে ৯১% শিশু ও তরুণ।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। এবারের ” বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২০ “এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ” মানসিক স্বাস্থ্য সবার জন্য।বৃহত্তর বিনিয়োগ – বৃহত্তর বৃদ্ধি।”

সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্য একটি সুস্থ জীবনযাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তবে একজন মানুষের মধ্যে জেনেটিক্স, অসুস্থতা, হরমোনের সমস্যা, পরিবেশ -পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার মান,কোন খারাপ ঘটনা / স্মৃতি প্রভৃতি কারণে মন খারাপ, বিষণ্ণতা, হতাশার মতো কিছু মানসিক অসুস্থতার সৃষ্টি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, “আমাদের দৈনন্দিন ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভাস এই হতাশার ঝুঁকিকে আরও বৃদ্ধি করতে পারে”।ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াটিস্ট ড্রিউ রেমজি বলেন, “পুষ্টি মানুষের বোধশক্তি, আচরণ এবং আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত”। সুতরাং, মানসিক সুস্থতার জন্য সঠিক ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করা আবশ্যক। এবার জেনে নেয়া যাক কিছু পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার সম্পর্কে যা আমাদের মানসিক সুস্বাস্থ্য রক্ষার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে –

ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ সাইকিয়াট্রি জানিয়েছে, শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফলিক এসিডের অভাবের ফলে দেখা দিতে পারে মানসিক বিপর্যয়। গবেষকেরা প্রমাণস্বরূপ দেখিয়েছেন, যাদের রক্তে ফলেটের মাত্রা স্বাভাবিকের চাইতে কম তারা তুলনামূলক বেশি বিষণ্ণ থাকেন। ফোলেট যুক্ত খাবার গ্রহন করলে দেহে সেরোটোনিন লেভেল বৃদ্ধি পায় যা হতাশা দমনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় এই পুষ্টি উপাদান পাওয়া যাবে প্রাকৃতিক বিভিন্ন খাবার থেকেই। ব্রকলি, সবুজ শাক, কলিজা,বাদাম,ডিম ইত্যাদি খাবার ফলেটের অভাব পূরণ করে থাকে।

মন ফুরফুরে রাখতে ডার্ক চকলেটকে হ্যাঁ বলুন। কেননা, কোকো বিনে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, “ফ্লাভোনয়েড” আমাদের মেজাজ ভালো রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ পরিমানে “ফ্লাভোনয়েড” গ্রহন করলে মেজাজ মর্জি ভালো থাকে।

সাইকোলজি টুডের লেখক জানান, গবেষণা নিশ্চিত করেছে ভিটামিন-ডি এর অভাবে মানসিক বিষণ্ণতা সমস্যা সিজনাল এফেক্টিভ ডিজঅর্ডার (এসএডি) এর সমস্যা বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও তিনি জানান, ভিটামিন-ডি এর অভাবে বেশ কিছু মানসিক সমস্যাও দেখা দেওয়া শুরু করে।আরো কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন ‘ডি’ কাজের স্মৃতি ও মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করে ও হতাশার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কাজেই প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন-ডি গ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা।যকৃত,সামুদ্রিক মাছ,দুধ,দই ইত্যাদিতে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়।এছাড়াও ভিটামিন ‘ডি-এর একটি বড় উৎস হলো সকালের মিষ্টি রোদ। ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিয়ম করে সকালে রোদে একটু হাঁটাহাঁটি করা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী।

মানসিক স্বাস্থ্যের উপর অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা,অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়া থেকেই নব্বই শতাংশের বেশী “ফিল গুড নিউরোট্রান্সমিটার কেমিক্যাল” সেরোটেনিন উৎপন্ন হয়। ফারমেন্টেড খাবার, অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়া বা প্রোবায়োটিকের উৎকৃষ্ট উৎস। দই, বাটার মিল্ক, চিজ, লাচ্ছি, মাঠা এই ফারমেন্টেড খাবার।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেহে “টাইরোসিন”নামক অ্যামিনো এসিডের অভাবের সাথে হতাশা বা বিষণ্ণতার সম্পর্ক রয়েছে। “টাইরোসিন” ডোপামিন নামক হরমোন তৈরী করে আর ডোপামিন হরমোন মস্তিকে ভালোলাগার অনুভূতি তৈরী করে।চিজ,ডিম,সালমন,মাংস ইত্যাদি টাইরোসিন বৃদ্ধি করে।
একাডেমি অফ নিউট্রিশন এন্ড ডায়েটিকস-এর নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান টরে আরমুল জানান, মানসিক বিপর্যয় বিশেষ করে হতাশা ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে জিঙ্কযুক্ত খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়।তিনি আরো বলেন, ‘মানব শরীর নিজ থেকে এই পুষ্টি উপাদান তৈরি করতে পারে না বলে খাদ্য উপাদান থেকেই এই পুষ্টি সংগ্রহ করা প্রয়োজন’।শামুক,ঝিনুক,কলিজা,মাছ,মাংস,কলা ইত্যাদি জিংকের উৎস।

আমাদের মস্তিষ্কে যে রাসায়নিকটি আমাদের মন ভালো রাখতে সাহায্য করে সেই রাসায়নিক নাম হল সেরোটোনিন। ম্যাগনেসিয়াম এই রাসায়নিকটি উৎপাদন ও তার ঠিকঠাক কাজ চালিয়ে যেতে সহায়তা করে। তাই ম্যাগনেসিয়াম হল এমন একটি খনিজ যা মানসিক চাপ ও চাঞ্চল্য দূর করে! টফু,সয়াবিন,অ্যাভকেডো,মাছ,ডার্ক চকলেট ইত্যাদি ম্যগনেসিয়াম জাতীয় খাদ্য।

ভিটামিন’ বি-১২’ যুক্ত খাবার যেমন: কলিজা,ডিম,মাছ,দুধ ইত্যাদি ম্যানিয়া কিংবা সাইকোসিস সহ মানসিক চাপ,স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা,হতাশা,বিষণ্ণতা,অবসাদ, ক্লান্তি, প্রভৃতি মানসিক রোগ দূর করতে ভূমিকা রাখে।

ভিটামিন বি১ সমৃদ্ধ খাবার মানসিক চাপ দূর করে।যেমন:মটরশুটি,শীমেরবীচি,লালআটা,বাদাম,মাছ ইত্যাদি বি১ এর উৎস।

ভিটামিন বি৩ বিষন্নতা কাটাতে সহায়তা করে।যেমন:কলিজা,গম,টুনা,মুরগীর বুকের মাংস,ডিম ইত্যাদি।
প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি খাদ্যাভ্যাস মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী।
এছাড়াও আরো অনেক পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার আছে যা আমাদের মানসিক সুস্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে।সুতরাং, খাদ্য শুধু শারীরিক সুস্থতার জন্য নয় বরং এটি আমাদের মানসিক সুস্থতাকেও নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করে। তবে অনিয়মিত,অপরিকল্পিত বা চাহিদার থেকে কোনো খাবার কম বা বেশি গ্রহণ করা উচিত নয়। সবসময় শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই পরিকল্পিত সঠিক ও সুষম পুষ্টিগুনসম্পন্ন খাবার পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। আসুন আমরা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাদ্যাভাসে অভ্যস্ত হই এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকি।
এম,এইচ,মোবাশ্বিরা।
ন্যাশনাল কলেজ অব হোম ইকনমিক্স। (১ম বর্ষ)
অফিসয়াল ভলান্টিয়ার নিউট্রিপ্রেনার বাংলাদেশ

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Like us at Facebook

Default description


This will close in 30 seconds